এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় কাটার একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করে, যার মধ্যে এর ঐতিহাসিক বিবর্তন, বহুমুখী সমস্যা ও প্রভাব এবং টেকসই সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত এবং শাসনতান্ত্রিক মাত্রাগুলি গভীরভাবে পরীক্ষা করে, যা মানব জীবনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং নগরীয় স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জের কারণ হয়েছে। প্রতিবেদনটি তুলে ধরেছে কিভাবে ঐতিহাসিক নীতি, দ্রুত নগরায়ণ এবং প্রভাবশালী সত্তার অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব চট্টগ্রামের পাহাড়গুলির পদ্ধতিগত ধ্বংসের কারণ হয়েছে। এটি বিধ্বংসী ভূমিধস এবং দুর্বল সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতির মতো ভয়াবহ পরিণতিগুলি পরীক্ষা করে, পাশাপাশি বর্তমান আইনি ও প্রয়োগকারী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলিও তুলে ধরে। পরিশেষে, এটি পাহাড়ের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ব্যাপক কাঠামো তুলে ধরে, যা শক্তিশালী আইনি সংস্কার, পরিবেশগত পুনরুদ্ধার, আর্থ-সামাজিক বিকল্প এবং সমন্বিত নীতি পরিকল্পনার উপর জোর দেয় যাতে চট্টগ্রামের অনন্য পাহাড়ি ভূদৃশ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করা যায়।
১. ভূমিকা
১.১. প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব: চট্টগ্রামের পাহাড়ের পরিবেশগত ও সামাজিক তাৎপর্য
চট্টগ্রাম, যা প্রায়শই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত, তার অনন্য পাহাড়ি ভূসংস্থান দ্বারা চিহ্নিত, যা এর পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক প্রাকৃতিক দৃশ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পাহাড়গুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে কাজ করে, যা অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু চক্র এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে। এগুলি পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং অপরিহার্য বাস্তুতন্ত্র পরিষেবা সরবরাহ করে। তবে, কয়েক দশক ধরে, দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জমির অদম্য চাহিদার কারণে ব্যাপক ও প্রায়শই অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ফলে এই পাহাড়গুলি অবিরাম অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। এই অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ একটি প্রাকৃতিক সম্পদকে বারবার বিপর্যয়ের উৎস, প্রধানত বিধ্বংসী ভূমিধস, মানব জীবনের মর্মান্তিক ক্ষতি এবং ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষতির কারণ করে তুলেছে। চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার বিষয়টি কেবল একটি পরিবেশগত উদ্বেগ নয়; এটি নগরীয় স্থায়িত্ব, মানবাধিকার এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গভীর প্রভাব সহ একটি জটিল আর্থ-সামাজিক এবং শাসনতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিবেদনটি এই গুরুতর সমস্যাটির একটি ব্যাপক ধারণা প্রদানের চেষ্টা করে, এর ঐতিহাসিক মূল খুঁজে বের করে, এর বিভিন্ন প্রভাব বিশ্লেষণ করে এবং কার্যকরী, টেকসই সমাধান প্রস্তাব করে।
১.২. প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ও পরিধি
এই বিশেষজ্ঞ-স্তরের প্রতিবেদনের লক্ষ্য হলো:
- চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার ঐতিহাসিক গতিপথ নথিভুক্ত করা, মূল সময়কাল, চালিকা শক্তি এবং ধ্বংসের মাত্রা চিহ্নিত করা।
- পাহাড় কাটার ফলে সৃষ্ট বহুমাত্রিক সমস্যাগুলি বিশ্লেষণ করা, যার মধ্যে পরিবেশগত অবক্ষয় (ভূমিধস, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমি ক্ষয়), সামাজিক সংকট (প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, আদিবাসী সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব) এবং শাসনতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ (আইনি ফাঁকফোকর, প্রয়োগের ব্যর্থতা, প্রভাবশালী অভিনেতাদের প্রভাব) অন্তর্ভুক্ত।
- পাহাড় কাটা প্রতিরোধ এবং এর প্রভাব প্রশমিত করার জন্য সরকারি সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীজনদের দ্বারা গৃহীত বর্তমান পদক্ষেপগুলির কার্যকারিতা এবং সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন করা।
- বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সর্বোত্তম অনুশীলনগুলি থেকে প্রাপ্ত টেকসই সমাধানগুলির একটি ব্যাপক কাঠামো প্রস্তাব করা, যা আইনি, পরিবেশগত, সামাজিক এবং নীতিগত হস্তক্ষেপগুলিকে একীভূত করে।
এই প্রতিবেদনের পরিধি প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকা এবং এর তাৎক্ষণিক পাহাড়ি পরিবেশের উপর কেন্দ্রীভূত, তবে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যেখানে প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে ঐতিহাসিক ভূমি-ব্যবহার পরিবর্তন এবং আদিবাসী অধিকারের ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনটি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংশ্লেষণ করে, যার মধ্যে একাডেমিক গবেষণা, সংবাদ প্রতিবেদন, সরকারি নথি এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত, যাতে বিষয়টির উপর একটি সূক্ষ্ম এবং প্রামাণিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করা যায়।
২. চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য
২.১. পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য
চট্টগ্রামের পাহাড়ি ভূখণ্ড এর প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ধারণ করে এবং অপরিহার্য বাস্তুতন্ত্র পরিষেবা সরবরাহ করে। এই পাহাড়গুলি কেবল ভূতাত্ত্বিক গঠন নয়, বরং প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র যা বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলকে সমর্থন করে, যার মধ্যে অনেকগুলি এই অঞ্চলের জন্য অনন্য। এই পাহাড়গুলির প্রাকৃতিক বন পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে, স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কার্বন শোষক হিসেবে কাজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলি জল ধরে রাখার জন্যও অত্যাবশ্যক, যা ভূগর্ভস্থ জল পুনরায় পূরণ করতে এবং ভারী বর্ষণের সময় দ্রুত জলপ্রবাহ প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। এই পাহাড়গুলির উপস্থিতি অঞ্চলের নান্দনিক ও বিনোদনমূলক মূল্যতে অবদান রাখে, যা দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হলে টেকসই পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশ্বব্যাপী পাহাড়গুলি 60-80% মিঠা পানির উৎস এবং বিশ্বের জনসংখ্যার এক-দশমাংশের আবাসস্থল, যা তাদের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
এই প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ কেবল পরিবেশগত বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং চট্টগ্রাম শহরের স্থিতিস্থাপকতার জন্য অপরিহার্য। পাহাড়গুলির জল ধরে রাখার ক্ষমতা সরাসরি নগরীয় নিষ্কাশন এবং বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। পাহাড় এবং বনাঞ্চলের ক্ষতি হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, যা শহরের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। একইভাবে, পাহাড়গুলি স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, যা নগরীয় তাপ দ্বীপ প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। পাহাড় এবং গাছপালা কমে গেলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা শহরের জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করে। এভাবে, পাহাড়, বনভূমি এবং জলাশয়গুলির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস শহরের ভারী বৃষ্টিপাত এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার মতো পরিবেশগত চাপ মোকাবেলা করার ক্ষমতাকে সরাসরি দুর্বল করে। এটি বিপর্যয়ের প্রতি শহরের দুর্বলতা বাড়ায় এবং নগরীয় জীবনযাত্রার মান হ্রাস করে। অতএব, পাহাড় সংরক্ষণ কেবল একটি পরিবেশগত বিলাসিতা নয়, বরং শহরের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকা এবং সমৃদ্ধির জন্য একটি মৌলিক প্রয়োজন।
২.২. পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ভূমিধসের প্রবণতা
চট্টগ্রামের পাহাড়গুলি প্রধানত নরম মাটি এবং বালির মিশ্রণে গঠিত, যা তাদের সহজাতভাবে ক্ষয় এবং ভূমিধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে। এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যটির অর্থ হলো, পাহাড় কাটা বা বন উজাড়ের মতো যেকোনো ব্যাঘাত তাদের স্থিতিশীলতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই পাহাড়গুলির প্রাকৃতিক ঢাল, ভারী বর্ষণের সাথে মিলিত হয়ে, ভূমি চলাচলের জন্য একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। যখন পাহাড়গুলিকে খাড়া কোণে কাটা হয়, তখন তাদের স্থিতিশীলতা আরও কমে যায়, যা তাদের ধসের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তোলে। বন উজাড় এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, কারণ গাছের শিকড়, যা সাধারণত মাটিকে ধরে রাখে, তা অপসারণ করা হয়, যার ফলে মাটির সংহতি হ্রাস পায় এবং জল অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ভারী বৃষ্টির সময় ফাটল সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে পাহাড় ধসে পড়ে।
এই বিশ্লেষণ থেকে এটি পরিষ্কার যে চট্টগ্রামের পাহাড়ধসের সমস্যাটি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং মানবসৃষ্ট কার্যক্রম দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত একটি সংকট। যদিও পাহাড়গুলির নরম মাটির গঠন তাদের ভূমিধসের প্রতি সহজাতভাবে সংবেদনশীল করে তোলে, তবে অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন এই প্রাকৃতিক দুর্বলতাকে বিপর্যয়ে রূপান্তরিত করার প্রধান অনুঘটক এবং পরিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা ভূমিধসের ঘটনাকে আরও ঘন ঘন এবং মারাত্মক করে তোলে। এর অর্থ হলো, এই সমস্যার সমাধান কেবল দুর্যোগ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করলে হবে না, বরং মানবসৃষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা এবং প্রকৌশলগত হস্তক্ষেপের উপর জোর দিতে হবে যা প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাগুলিকে সম্মান করে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠনকে বিবেচনায় না নিয়ে যথেচ্ছভাবে কাটা এবং বসতি স্থাপন করা হলে, তা অনিবার্যভাবে আরও বিপর্যয় ডেকে আনবে।
৩. চট্টগ্রামের পাহাড় কাটার ইতিহাস ও কারণ
৩.১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিবর্তন
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার ইতিহাস দীর্ঘ এবং বহুস্তরীয়, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে শুরু হয়ে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে, সরকার বনজ সম্পদ থেকে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল ঝুম চাষের উপর কর আরোপ এবং ১৮৮০-এর দশকের প্রথম দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক-চতুর্থাংশ ভূমি সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা, যেখানে ঝুম চাষে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ১৮৭১ সালের মধ্যে প্রায় সমস্ত বন সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা বাণিজ্যিক শোষণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের গাছ ও বনজ পণ্য কাটার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যার ফলে রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং এই অঞ্চলে বন উজাড় তীব্র হয়।
পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলেও চট্টগ্রামে পাহাড়ের সংখ্যা কমেছে। পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশদের চেয়েও আগ্রাসী এবং ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় এবং পরিবেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর ছিল। শিল্পায়নের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর ফলে ২২,০০০ হেক্টর সমতল আবাদি জমি পানির নিচে চলে যায়, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট সমতল আবাদি জমির ৪০ শতাংশের সমান। এতে প্রায় ১ লক্ষ আদিবাসী মানুষ তাদের জমি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়। এই বাস্তুচ্যুতি বনভূমির উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে, কারণ বাস্তুচ্যুতদের অনেকেই ঝুম চাষের জন্য বনভূমি কাটতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী সমতল ভূমি থেকে ৪০০,০০০ ভূমিহীন বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এনে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ঘটানোর জন্য একটি অভিবাসন কর্মসূচি শুরু করে। এতে হাজার হাজার আদিবাসী বাস্তুচ্যুত হয় এবং বন ও ভূমি সম্পদের উপর চাপ আরও তীব্র হয়, কারণ বাইরের অভিবাসন রোধকারী পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা হয়েছিল। এর ফলে ঝুম চাষের জন্য জমির অভাব দেখা দেয় এবং আদিবাসীরা ঝুম চাষের পতিত সময়কাল ১৫-২০ বছর থেকে ৩-৪ বছরে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়, যা পরিবেশের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।
স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৮৮টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে এবং ৯৫টি আংশিকভাবে কাটা হয়েছে। এরপরের ১২ বছরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের মতে, চার দশকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে, যা ৪০ বছর আগের ২০০টি পাহাড়ের ৬০ শতাংশ। এই সময়ে, শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে পাহাড় ধ্বংসও বেড়েছে। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখান বাজার, মতিঝরনা, ষোলশহর এবং ফয়’স লেক এলাকায় বেশিরভাগ পাহাড় কাটা হয়েছে। ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম নগর ও এর আশেপাশের এলাকায় ১৮.৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কাটা হয়, যা মোট পাহাড়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৭৪ শতাংশ পাহাড় কাটা পড়ে পাঁচলাইশ থানায়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নিজেই ফৌজদারহাট-বায়েজিদ বাইপাস সড়ক নির্মাণে ১৫টি পাহাড় কেটেছে। এই সড়ক নির্মাণের সময় অনুমোদনের চেয়ে বেশি পাহাড় কাটায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সিডিএকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার সমস্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী, পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার ফল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া বনজ সম্পদ শোষণ এবং ভূমি-ব্যবহারের পরিবর্তন, পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলের আগ্রাসী উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনসংখ্যা স্থানান্তরের নীতি, এবং স্বাধীন বাংলাদেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য—এই সবই পাহাড় ধ্বংসের ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে। এই ধারাবাহিকতা কেবল পরিবেশগত অবক্ষয়ই ঘটায়নি, বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি ও তাদের জীবনযাত্রার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা বর্তমান সংকটের গভীরতা এবং জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
৩.১. প্রধান কারণসমূহ
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার পেছনে একাধিক আন্তঃসংযুক্ত কারণ বিদ্যমান, যা এই সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
৩.২.১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি
চট্টগ্রাম মহানগরীর দ্রুত নগরায়ণ এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা পাহাড় কাটার অন্যতম প্রধান কারণ। শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আবাসন ও অবকাঠামোর চাহিদা বেড়েছে। এই চাহিদা মেটাতে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিঘর তৈরি করা হয়। এসব বস্তিঘরে কম টাকায় থাকার সুযোগ মেলে এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও সহজে পাওয়া যায়, যা কিছু অসাধু সেবা সংস্থার কর্মচারীর সহায়তায় সম্পন্ন হয়। একটি মিটার থেকে ১০-১২টি ঘরে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। এই অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢালকে দুর্বল করে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রীষ্মকালে এই বসতিগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হলেও, বর্ষায় প্রশাসন তাদের সরিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি কেবল পাহাড়ের পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকেই নষ্ট করে না, বরং হাজার হাজার মানুষকে ভূমিধসের মতো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
৩.২.২. ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকা শক্তি হলো ভূমিদস্যু এবং প্রভাবশালী মহল। এসব প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আবাসন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করে পাহাড় কেটে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। জরিমানা বা মামলা দিয়েও তাদের দমানো যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কাউন্সিলরও পাহাড় কাটার সাথে জড়িত। প্রশাসনের অভিযান থেকে বাঁচতে তারা রাত হলেই পাহাড় কাটার কাজ শুরু করে।
বিভিন্ন সময়ে চিহ্নিত কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান পাহাড় কাটার সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কেএসআরএম, বিএসআরএম, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, গোল্ডেন ইস্পাত, ইলিয়াস ব্রাদার্স (এমইবি ব্রিক্স), আবুল খায়ের গ্রুপ, চট্টগ্রামের এমএইচ গ্রুপ এবং ঢাকার এফআর রিফাইনারি ও একটি টায়ার ফ্যাক্টরি। স্বপ্নীল ফ্যামিলি ওনার্স নামের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানও পাহাড় কেটে আবাসন নির্মাণে জড়িত, যার মালিকানায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী সজল চৌধুরী, খোকন ধর, হিমেল দাশ, সুভাষ নাথ, রনজিত কুমার দে, রূপক সেনগুপ্তসহ মোট ৯২ জন ব্যক্তি রয়েছেন। এসব প্রভাবশালীরা পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট খুপরি ঘর তৈরি করে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থের মালিক হচ্ছে। এই ধরনের কার্যক্রম আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। এই পরিস্থিতি একটি গভীর শাসনতান্ত্রিক ঘাটতিকে নির্দেশ করে, যেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যাহত হয়।
৩.২.৩. সরকারি সংস্থার ভূমিকা ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প
কিছু ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাও পাহাড় কাটার সাথে জড়িত, যা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কেটেছে। যেমন, সিডিএ বায়েজিদ-ফৌজদারহাট বাইপাস সড়ক নির্মাণে ১৬টি পাহাড় কেটেছে। যদিও এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছিল, তবে প্রকল্পের জন্য কী পরিমাণ পাহাড় কাটতে হবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অধ্যয়ন ছিল না। সড়ক তৈরির জন্য পাহাড় ২২ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটার নিয়ম থাকলেও, এখানে খাড়াভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে, যা ভূমিধসের ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটাচ্ছে।
সিডিএ-কে অনুমোদনের বেশি পাহাড় কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল, যদিও প্রথমে ১০ কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছিল। তবে, এই জরিমানার টাকা এখনও পরিশোধ করা হয়নি এবং সিডিএ নতুন করে আরও পাহাড় কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি সরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাবকে তুলে ধরে। পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন পাহাড় কাটা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, যেখানে সরকারি সংস্থাগুলি পরিবেশ সংরক্ষণে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, সেখানে তাদের অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং সমন্বয়হীনতা নিজেরাই পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নয়, বরং উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে একটি মৌলিক নীতিগত সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।
৩.২.৪. জুম চাষ ও বন উজাড়
ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ পদ্ধতি, যা পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী কৃষকরা যুগ যুগ ধরে অনুসরণ করে আসছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এর পরিবেশগত প্রভাব পরিবর্তিত হয়েছে। অতীতে, প্রতিটি পাহাড়ে ২০-২৫ বছর পর পর জুম চাষ করা হতো, যা পরিবেশের জন্য ততটা ক্ষতিকর ছিল না এবং প্রকৃতি তার জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারতো। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়তি খাদ্য চাহিদা মেটাতে এখন একই জমিতে ২-৩ বছর পর পর জুম চাষ করা হচ্ছে, যার ফলে ভূমিক্ষয় এবং ভূমিধস ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং মাটির উর্বরতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে।
এছাড়াও, ব্যাপক হারে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ মাটি ক্ষয় ও ভূমিধসকে ত্বরান্বিত করছে। পাহাড়ি বনাঞ্চল ধ্বংস করার কারণেও পাহাড় ধস হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক বন কেটে গজারি, সেগুন, রাবার ও ফলদ বাগান তৈরি করার কারণেও পাহাড় ধসে পড়ছে। এই গাছগুলোর শিকড়ের বিস্তৃতি কম এবং তেমন শক্তিশালী নয়, ফলে মাটি আঁকড়ে ধরে রাখতে পারছে না, যা মাটিকে আলগা ও শুকনো করে দিচ্ছে। ফসলের ফলন বাড়াতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে মাটি ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে পাহাড়ে ক্রমবর্ধমান ফল বাগানে কৃষকরা ব্যাপকহারে আগাছানাশক ব্যবহার করায় পাহাড়ি ঢালের মাটি উন্মুক্ত হয়ে ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হচ্ছে। এই কারণগুলি সম্মিলিতভাবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ায়।
৪. পাহাড় কাটার সমস্যা ও প্রভাব
পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রামে পরিবেশগত ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা শহরের স্থিতিশীলতা এবং জনজীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
৪.১. পরিবেশগত প্রভাব
৪.১.১. ভূমিধস ও প্রাণহানি
পাহাড় কাটার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং ভয়াবহ পরিণতি হলো ভূমিধস, যা প্রতি বছর অসংখ্য প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। গত ১৬ বছরে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন এবং ভারী বর্ষণ ভূমিধসের প্রধান কারণ। যখন পাহাড় কাটা হয়, তখন ভূমির ঢাল বৃদ্ধি পায়, গাছপালার আচ্ছাদন বিনষ্ট হয় এবং মাটির দৃঢ়তা হ্রাস পায়, ফলে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে এবং পাহাড় ধসে পড়ে।
চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিধসের ঘটনা ও হতাহতের চিত্র নিম্নরূপ:
তারিখ | স্থান | হতাহত |
১১ জুন ২০০৭ | সেনানিবাস এলাকা, মতিঝরনা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা | ১২৭ জন নিহত |
১৮ আগস্ট ২০০৮ | লালখানবাজার মতিঝরনা | ১২ জন নিহত |
১ জুলাই ২০১১ | টাইগারপাস, বাটালি হিল | ১৭ জন নিহত |
২৬-২৭ জুন ২০১২ | ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকা | ২৩-২৪ জন নিহত |
৭ এপ্রিল ২০২৩ | আকবরশাহ, বেলতলীঘোনা | ২ জন নিহত |
২৭ আগস্ট ২০২৩ | ষোলশহর | বাবা-মেয়ে নিহত |
১৮-১৯ আগস্ট ২০২৪ | চট্টগ্রাম বিভাগ | ৫ জন নিহত |
ভূমিধসের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবহন ব্যাহত হয়। এই পুনরাবৃত্তিমূলক এবং ক্রমবর্ধমান মারাত্মক ভূমিধসের ঘটনাগুলি পাহাড় কাটার সাথে সরাসরি যুক্ত, যা মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। হতাহতের সংখ্যা এই মানবিক সংকটের জরুরি অবস্থাকে জোরদার করে।
৪.১.২. জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি
পাহাড় কাটার ফলে কেবল ভূমিধসই হয় না, বরং এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পার্বত্য অঞ্চল জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, কিন্তু ভূমিদখল, কৃষি একচেটিয়াকরণ, পাহাড় কাটা এবং পাথর উত্তোলনের কারণে গত ২৫ বছরে এর প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে স্থানীয় গাছের প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রাকৃতিক বন উজাড় করে একচেটিয়া সেগুন বা গামারের মতো বৃক্ষরোপণ বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্যকে আরও খারাপ করেছে।
ঐতিহ্যবাহী ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উপর বাহ্যিক শাসন কাঠামোর চাপ পরিবেশগত অবক্ষয় এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনের ক্ষতি ঘটিয়েছে। আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে আসছে, কিন্তু তাদের ক্রমাগত উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন ও বসবাসের জন্য জমি দ্রুত দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এই বাস্তুতান্ত্রিক ক্ষতি কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশকেই প্রভাবিত করে না, বরং অঞ্চলের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, জল ধরে রাখা এবং কার্বন শোষণের ক্ষমতাকেও দুর্বল করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৪.১.৩. জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি
পাহাড় কাটার পাশাপাশি জলাশয় ভরাট করাও চট্টগ্রামের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। চার দশক আগেও চট্টগ্রামে প্রায় ২৫ হাজার পুকুর-জলাশয় ছিল, কিন্তু বর্তমানে টিকে আছে এক হাজারের কিছু বেশি, যা দখল-দূষণে জর্জরিত। ৪০ বছরের ব্যবধানে কমপক্ষে ২৪ হাজার পুকুর-জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। এই পুকুর ভরাট এবং পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রামে নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব পড়ছে।
জলাশয় ভরাট হওয়ার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাৎক্ষণিক পানি পাওয়া যায় না। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, কারণ পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথগুলি বাধাগ্রস্ত হয়। গ্রীষ্মকালে শহরের তাপমাত্রা বাড়ছে, যা নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। পাহাড়, বনভূমি এবং জলাশয়গুলি প্রাকৃতিক জল ধারণ এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এদের ধ্বংসের ফলে শহরের প্রাকৃতিক স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যেমন অতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রার বৃদ্ধি, মোকাবেলায় শহরকে আরও দুর্বল করে তোলে। এই সমস্যাগুলি একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং একটির ক্ষতি অন্যটির উপর প্রভাব ফেলে, যা সামগ্রিকভাবে নগরীয় পরিবেশের অবনতি ঘটায়।
৪.২. সামাজিক ও মানবিক প্রভাব
৪.২.১. ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ও বাস্তুচ্যুতি
পাহাড় কাটার ফলে সৃষ্ট ভূমিধস এবং পরিবেশগত অবক্ষয় সরাসরি মানব জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে শ্রমজীবী মানুষ কম টাকায় পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিঘরে বসবাস করতে বাধ্য হয়। এসব ঘরে অবৈধ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও সহজে মেলে, যা কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে, বর্ষাকালে এই স্থানগুলি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং প্রশাসন তাদের সরিয়ে দেয়। ২০০৭ সালের ভূমিধসে ৭২টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল এবং প্রায় ২০০টি পরিবার স্থায়ীভাবে তাদের আশ্রয় হারিয়েছিল।
আদিবাসী জনগণ, যারা প্রজন্ম ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে আসছে, তাদের ক্রমাগত উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন ও বসবাসের জন্য জমি দ্রুত দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ১০০,০০০ আদিবাসী মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল, যারা স্থায়ীভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহের জমি হারিয়েছিল। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী সমতল ভূমি থেকে ভূমিহীন বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত করার কর্মসূচি গ্রহণ করে, যার ফলে হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এই ঐতিহাসিক এবং চলমান বাস্তুচ্যুতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানকে আরও খারাপ করেছে, কারণ তাদের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের জন্য নিম্নমানের মাটির এলাকায় স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক অবিচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে।
৪.২.২. স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর প্রভাব
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যারা দেশের মোট ভূমির প্রায় ১২% পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে, তারা সংস্কৃতিগত ও সামাজিকভাবে দেশের বাকি অংশের থেকে ভিন্ন। দুর্ভাগ্যবশত, এই গবেষণাগুলি দেখায় যে আদিবাসী জনগণ বৈষম্যের শিকার হন কারণ তাদের সংস্কৃতি ও চেহারাকে সামাজিক প্রান্তিককরণের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি শাসন এবং এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারও আদিবাসীদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপায় অবলম্বন করেছে, যাতে তাদের বশীভূত করা যায়।
আদিবাসী জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ইতিহাসকে বিকৃত করা, তাদের দমনমূলক আইনের শিকার করা, সামরিক উদ্দেশ্যে এবং অভিবাসী বসতি স্থাপনকারীদের জন্য তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করা, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে সামরিক বাহিনী পাঠানো এবং লজ্জাজনক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করা—এগুলি সবই আদিবাসীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্র এবং আদিবাসী জনগণের মধ্যে সংঘাতের একটি কারণ হলো প্রাকৃতিক সম্পদের উপস্থিতি। আদিবাসী জনগণ ঐতিহ্যগতভাবে যে ভূমিতে বসবাস করে, সেখানে প্রাকৃতিক সম্পদের উপস্থিতি প্রায়শই ভূমি অধিকার বিরোধের সূত্রপাত ঘটায়। এই সংঘাতগুলি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি এবং জীবিকার উপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা তাদের সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করে।
৫. আইন ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা রোধে আইন থাকলেও এর প্রয়োগে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
৫.১. বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা
বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশগত মান উন্নয়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনকল্পে প্রণীত আইন রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০১০-এর ধারা ৬খ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন ও/বা মোচন (cutting and/বা razing) করা যাইবে না। তবে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণক্রমে কোনো পাহাড় বা টিলা কর্তন বা মোচন করা যেতে পারে। পাহাড় কাটার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই আইনটি পাহাড় সংরক্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি প্রদান করে।
৫.২. আইন প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ ও দুর্বলতা
আইন থাকা সত্ত্বেও, চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে, যা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে গভীর দুর্বলতা নির্দেশ করে। ভূমিধসের ঘটনাগুলি প্রায়শই আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার উদাহরণ। আইনি দুর্বলতার কারণে পাহাড় কাটা ও পুকুর ভরাট ধারাবাহিকভাবে চলছে এবং অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযোগের শুনানি শেষে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলেও, এসব ঘটনার সুরাহা করতে পারে না। বিশেষ করে, আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত কোনো নজির স্থাপন করতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর প্রায়শই অভিযোগ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে না, যার ফলে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগ অস্বীকার করে। এছাড়া, পাহাড় কাটায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলির প্রভাব-প্রতিপত্তি একটি বড় বাধা। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে, যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জরিমানা বা মামলা দিয়েও এসব পাহাড়খেকোদের দমানো যাচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, সিডিএ-কে পাহাড় কাটার জন্য প্রথমে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও, পরে তা ৫ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয় এবং সেই টাকাও এখনও পরিশোধ করা হয়নি।
কিছু ক্ষেত্রে, জমি বাড়ি হিসেবে রেকর্ড হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর কিছুটা বেকায়দায় পড়ে। জমির মালিকেরা হাইকোর্ট থেকে ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রিট আদেশ নিয়ে আসেন, যেখানে জায়গাটিতে পাহাড় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় না এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে বিবাদী করা হয় না। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দুর্বলতা রয়েছে, যেমন মামলায় কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড একত্রে দেওয়ার সুযোগ নেই, ফলে অপরাধীরা কেবল জরিমানা দিয়েই পার পেয়ে যায়। এই সীমাবদ্ধতাগুলি পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
৫.৩. সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা
পাহাড় কাটা রোধে সরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়হীনতা একটি বড় সমস্যা। পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ প্রশাসন পাহাড় কাটা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সিডিএ পাহাড় কাটে, পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা করে, কিন্তু জরিমানার টাকা পরিশোধ হয় না এবং আরও পাহাড় কাটার পরিকল্পনা করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর বলে যে সিডিএ উদ্যোগ নিতে পারে, আর সিডিএ বলে যে পরিবেশ অধিদপ্তর অনেক কিছু করতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিডিএ-কে নতুন করে পাহাড় কাটার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য আইনি নোটিশ দিয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০১২ সালের আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও সিডিএ-এর নতুন করে পাহাড় কাটার সিদ্ধান্ত বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অবজ্ঞা। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, সরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে স্পষ্ট ম্যান্ডেট এবং উদ্দেশ্যের অভাব রয়েছে। উন্নয়ন বনাম পরিবেশ সংরক্ষণের এই দ্বন্দ্বে প্রায়শই পরিবেশের ক্ষতি হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিভেদ এবং সমন্বয়হীনতা কেবল নীতিগত পক্ষাঘাতই সৃষ্টি করে না, বরং পাহাড় ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে, কারণ কোনো একক সংস্থা কার্যকরভাবে সমস্যাটি সমাধান করতে পারে না।
৬. সমাধানের পথ: টেকসই ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সুপারিশ
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানের জন্য একটি বহু-মাত্রিক এবং সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজন, যা কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিবেশগত পুনরুদ্ধার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই নগর উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
৬.১. আইন ও প্রয়োগের শক্তিশালীকরণ
পাহাড় কাটা রোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার অপরিহার্য। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের পর্যাপ্ত সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং পরিবেশ আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড উভয়ই প্রয়োগের বিধান নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কাটা পাহাড়ের অংশগুলিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে ক্ষমতা ও সংস্থান দিতে হবে, যা বর্তমানে একটি বড় সীমাবদ্ধতা। এই পদক্ষেপগুলি কেবল অপরাধীদের দমনেই নয়, বরং পাহাড় সংরক্ষণে একটি শক্তিশালী আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপনেও সহায়ক হবে।
৬.২. সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও নগর উন্নয়ন
অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে একটি সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং নগর উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। চট্টগ্রাম সিটি মাস্টার প্ল্যান এবং ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (DAP) এর মধ্যে পাহাড় সংরক্ষণের কৌশলগুলিকে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাহাড় না কেটে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ের ঝুঁকি কমানো যায়, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে তাদের মতামত নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (Nature-based Solutions – NbS) এই ক্ষেত্রে একটি কার্যকর কাঠামো প্রদান করতে পারে। সুপরিকল্পিত NbS প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে কার্যকর হতে পারে। একই সাথে, এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, স্থানীয় অর্থনীতিকে সমর্থন এবং জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করে ঢাল সংরক্ষণে প্রকৌশলগত ব্যবস্থা, যেমন রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই নির্মাণ কাজগুলি অবশ্যই পরিবেশগত নীতিমালা মেনে হতে হবে, যাতে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি একক, সমন্বিত কর্তৃপক্ষ বা কার্যকর সমন্বয় প্রক্রিয়া স্থাপন করা প্রয়োজন, যা উন্নয়ন প্রকল্প এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে।
৬.৩. পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা
ধ্বংসপ্রাপ্ত পাহাড় এবং বনভূমি পুনরুদ্ধার করা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের পুনরুদ্ধার (Forest and Landscape Restoration – FLR) কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক (UN Decade on Ecosystem Restoration 2021-2030) এই ক্ষেত্রে একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চলমান বন ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের অবক্ষয় রোধ করতে এবং স্থানীয় বন-নির্ভর মানুষ ও প্রকৃতির উপকার করতে পারে।
যেসব পাহাড় ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে, সেগুলিতে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ আচ্ছাদন তৈরি করতে হবে। ৩০ ডিগ্রির বেশি খাড়া ঢালযুক্ত পাহাড়ে বন পরিষ্কার করা বন্ধ করতে হবে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাঠের নির্বিচার উত্তোলন বন্ধ করতে হবে, যা স্থানীয় গাছের প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। প্রাকৃতিক বনের পরিবর্তে মনোকালচার সেগুন বা গামারের মতো বৃক্ষরোপণ বন্ধ করতে হবে, কারণ এদের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে না। পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্রের উপর চাপ কমাতে ঝুম চাষের পতিত সময়কাল বাড়ানোর জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
৬.৪. ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ ও বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা
পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া একটি জরুরি পদক্ষেপ, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে। জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যেতে অনুরোধ করছে এবং জোন কমিটি গঠন করে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। তবে, এটি কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা। ভূমিধসে মৃত্যু রোধের স্থায়ী সমাধান হলো পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বন্ধ করা এবং বাস্তুচ্যুতদের জন্য পর্যাপ্ত ও টেকসই বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতে না হয়। আদিবাসী জনগণের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা এবং ঐতিহাসিক বাস্তুচ্যুতির সমস্যাগুলির সমাধান করাও জরুরি, যাতে তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি ও সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।
৬.৫. জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ
পাহাড় সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-এর মতো সংস্থাগুলি “পাহাড়ের ইকোসিস্টেম রক্ষার্থে পাহাড় কাটা ও গাছ কাটা বন্ধ করা ও টেকসই পাহাড় পর্যটন নীতি জরুরী” শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পাহাড়ের ইকোসিস্টেম, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় নীতি বিশ্লেষণ করে একটি “পাহাড়-বান্ধব পর্যটন” নীতি তৈরি করা জরুরি। টেকসই পর্বত পর্যটন অতিরিক্ত ও বিকল্প জীবিকার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং ল্যান্ডস্কেপ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারে।
আদিবাসী সম্প্রদায়, যারা ঐতিহ্যগতভাবে ভূমির ব্যবহার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণে নিজস্ব প্রথাগত আইন ও অনুশীলন অনুসরণ করে, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে জড়িত করতে হবে। তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পাহাড়কে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
৭. উপসংহার ও সুপারিশমালা
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা একটি বহু-মাত্রিক সংকট, যা ঐতিহাসিক শোষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য, এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের ফল। এর ভয়াবহ পরিণতি ভূমিধস, প্রাণহানি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, জলাবদ্ধতা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিসেবে প্রতীয়মান। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদী এবং অংশগ্রহণমূলক কৌশল অবলম্বন করা অপরিহার্য।
এই প্রতিবেদনের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সুপারিশমালা প্রস্তাব করা হলো:
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার:
আইনের কঠোর প্রয়োগ: পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে পাহাড় কাটার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি (১০ বছরের কারাদণ্ড) এবং জরিমানা উভয়ই প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে।
জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: পাহাড় কাটায় জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারি সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সিডিএ-এর মতো সরকারি সংস্থাগুলির উন্নয়ন প্রকল্পগুলি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে এবং অনুমোদনের অতিরিক্ত পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
পুনরুদ্ধার বাধ্যতামূলককরণ: পরিবেশ অধিদপ্তরকে কাটা পাহাড়ের অংশগুলিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও সংস্থান প্রদান করতে হবে এবং এই বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা:
বিস্তৃত নগর পরিকল্পনা: চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য একটি সুদূরপ্রসারী ও পরিবেশ-সংবেদনশীল মাস্টার প্ল্যান এবং ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (DAP) প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যা পাহাড় সংরক্ষণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।
প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান: ভূমিধস প্রতিরোধ এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বাড়াতে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (Nature-based Solutions – NbS) যেমন বৃক্ষরোপণ, ঢাল স্থিতিশীলকরণ এবং জল নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে।
আন্তঃসংস্থা সমন্বয়: পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি বা কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যাতে উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও বিকল্প জীবিকা:
ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন: পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত থাকে।
আদিবাসী অধিকার সংরক্ষণ: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিকে সম্মান করতে হবে। কাপ্তাই বাঁধের মতো অতীতের বাস্তুচ্যুতির শিকারদের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিকল্প জীবিকার সুযোগ: ঝুম চাষের উপর চাপ কমাতে এবং বনভূমি সংরক্ষণে আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবেশ-বান্ধব বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও সচেতনতা:
ব্যাপক বনায়ন ও পুনরুদ্ধার: কাটা পাহাড়গুলিতে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগিয়ে ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং বন ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের পুনরুদ্ধার (FLR) কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: পাহাড় সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় সম্প্রদায় পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করতে হবে।
পর্যটন নীতিমালা: টেকসই পর্বত পর্যটন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। অপরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
চট্টগ্রামের পাহাড়গুলি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জনজীবনের জন্য অপরিহার্য। এই পাহাড়গুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সম্মিলিত দায়িত্ব, যার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং জনসম্পৃক্ততা অপরিহার্য।
Comments